বাংলাদেশের সংবিধানে যেগুলো আপনার মৌলিক অধিকার।
রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের
কিছু অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া থাকে। এ অধিকারগুলো দেশের সংবিধানে বলা থাকে।
সংবিধানে উল্লিখিত অধিকারগুলোই একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। অনেকেই অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা প্রভৃতি মৌলিক অধিকার বলে
থাকলেও এগুলো হচ্ছে জীবনধারণের মৌলিক উপকরণ। মৌলিক অধিকার নয়।
বাংলাদেশের সংবিধানে তৃতীয় ভাগে
নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিয়ে বলা হয়েছে। সংবিধানে এ অধ্যায়ের শুরুতেই ২৬ নম্বর
অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মৌলিক অধিকারের সঙ্গে
অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো আইন করা যাবে না। আর যদি করা হয়, তবে তা বাতিল হয়ে যাবে।
সংবিধানে যেসব মৌলিক অধিকার আছে
আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনের আশ্রয়লাভ: আইনের দৃষ্টিতে প্রত্যেক নাগরিক সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী।
রাষ্ট্রের যেকোনো নাগরিকের আইনের আশ্রয়লাভের অধিকার আছে। কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, সুনাম বা সম্পত্তির
হানি ঘটে এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।
বৈষম্য করা যাবে না এবং সমান সুযোগ: ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ,
বাসস্থান বা পেশাগত কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করা যাবে
না। প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ এবং পদ লাভের ক্ষেত্রে সবার সমান সুযোগ থাকবে এবং
বৈষম্য করা যাবে না।
জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার: আইন অনুযায়ী ব্যতীত কাউকে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে
না।
গ্রেপ্তার ও আটকে রক্ষাকবচ: কোনো কারণে কাউকে আটক করা হলে, সেটির কারণ জানিয়ে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ
দিতে হবে। কোনো অবস্থায় কাউকে ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় হাজতে রাখা যাবে না। আটকের ২৪
ঘণ্টার মধ্যে পার্শ্ববর্তী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আটক ব্যক্তিকে হাজির করে যথাযথ
ব্যবস্থা নিতে হবে।
জবরদস্তিমূলক শ্রম নিষিদ্ধ: ফৌজদারি অপরাধের সাজাপ্রাপ্ত
আসামি ছাড়া কাউকে জোর-জবরদস্তি করে কোনো কাজ করানো যাবে না।
বিচার ও দণ্ড: কেউ কোনো অপরাধ করলে তাঁর বিচার
অবশ্যই ওই সময়ে প্রচলিত আইনে করতে হবে। এক অপরাধের জন্য একাধিকবার শাস্তি দেওয়া
যাবে না। প্রত্যেক নাগরিকের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারের অধিকার রয়েছে। কাউকে নিজের
বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না। কোনোভাবেই নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না।
চলাফেরার স্বাধীনতা: দেশের যেকোনো স্থানে অবাধ
চলাফেরা, যেকোনো স্থানে বসবাস ও বসতি স্থাপন
এবং দেশত্যাগের পর পুনঃপ্রবেশের স্বাধীনতা রয়েছে নাগরিকদের। তবে এ স্বাধীনতা হবে
জনস্বার্থে যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে।
সমাবেশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা: যেকোনো সমাবেশ বা সংগঠনের
অধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রেও জনশৃঙ্খলা, জনস্বাস্থ্য
ও নৈতিকতার স্বার্থ আইন দ্বারা বাধানিষেধ সাপেক্ষে অধিকার ভোগ করতে পারবে।
চিন্তা, বিবেক ও বাক্স্বাধীনতা: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি
রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা,
শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের মাধ্যমে যুক্তিসংগত বাধানিষেধ
সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের চিন্তা, বিবেক ও বাক্স্বাধীনতা
থাকবে। সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতাও একটি মৌলিক অধিকার।
পেশা ও ধর্মের স্বাধীনতা: যেকোনো নাগরিক আইন দ্বারা
বাধানিষেধ সাপেক্ষে যেকোনো কাজকে নিজের পেশা হিসেবে বাছাই করতে পারবেন। আইন, জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের নিজ
নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা থাকবে।
সম্পত্তির অধিকার: আইনের মাধ্যমে আরোপিত বাধানিষেধ
সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিক সম্পত্তি অর্জন, ধারণ,
হস্তান্তর করতে পারবেন।
গৃহ ও যোগাযোগের অধিকার: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলার স্বার্থে আইনের মাধ্যমে আরোপিত বাধানিষেধ
সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের নিজ গৃহে নিরাপত্তা লাভের অধিকার থাকবে। চিঠিপত্র ও
যোগাযোগের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার থাকবে।
মৌলিক অধিকারবঞ্চিত হলে
যদি কোনো কারণে মৌলিক অধিকার থেকে কেউ বঞ্চিত হয়, তাহলে এ ক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি সংবিধানের ১০২
অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে রিট আবেদন করার অধিকার রয়েছে।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ
সুপ্রিম কোর্ট।

কোন মন্তব্য নেই
কমেন্ট করুন